1. [email protected] : admi2019 :
  2. [email protected] : খুলনা বিভাগ : খুলনা বিভাগ
  3. [email protected] : Monir monir : Monir monir
  4. [email protected] : Mostafa Khan : Mostafa Khan
  5. [email protected] : mahin : mahin khan
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন

শব্দে ভাইরাস মরে, তবে থালা বাজিয়ে নয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২০
  • ৫৯ বার পঠিত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ১৯৪০ সালে একটি অদ্ভূত ঘটনা ঘটে। সেখানকার ট্যাকোমা ন্যারোজ নামের প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচু একটি সেতু ঘণ্টায় মাত্র চল্লিশ মাইল বেগে উড়ে আসা বাতাসের ধাক্কায় ভেঙে যায়। খুব চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা তৎকালীন বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়ারদের নজর কাড়ে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি গুরুগম্ভীর হলেও, সেতু ভেঙে পড়ার পিছনের কারণটা বেশ মজাদার।

আসলে প্রত্যেকটি বস্তুর কিছু নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক (প্রতি সেকেন্ডে কোনো তরঙ্গের পূর্ণ স্পন্দন সংখ্যা) থাকে। এই কম্পাঙ্কের সঙ্গে বাহ্যিক বলের কম্পাঙ্ক সমান হলে ওই বস্তুর কম্পাঙ্ক সর্বাধিক হয়। যেমন, আপনি আপনার প্রিয় গিটারটা হাতে নিয়ে সেটির কোনও একটি কর্ডে আঙুল দিয়ে আঘাত করলেন, আর গিটারের তারটা কাঁপতে কাঁপতে শব্দতরঙ্গ তৈরি করল। একে বলে রেজোন্যান্ট ফ্রিকোয়েন্সি। মুশকিল হয় রেজোন্যান্ট ফ্রিকোয়েন্সি বেসামাল হয়ে গেলে। যেমন, ট্যাকোমা ন্যারোজ ব্রিজ-এর কোনও একটি কম্পাঙ্ক বাতাসের কম্পাঙ্কের সঙ্গে সমান হতেই, সেতুর কম্পাঙ্ক সর্বাধিক হয়, আর তার ফলেই ঘটে ওই বিপত্তি।
প্রতি সেকেন্ডে শব্দের সম্পূর্ণ একটি তরঙ্গ যত বার এগোতে পারে, তাকে সেই শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক বলে। কম্পাঙ্ক যত বাড়ে শব্দের শক্তি তত বাড়ে। এই কম্পাঙ্ক মাপার একক বা ইউনিট হল হার্টজ। প্রতি সেকেন্ডে একটা তরঙ্গ মানে ১ হার্টজ। কম্পাঙ্ক প্রকাশ করা হয় কিলোহার্টজ, মেগাহার্টজ, গিগাহার্টজ, টেরাহার্টজ, পেটাহার্টজ, এক্সাহার্টজ এবং জিটাহার্টজ-এ। এক কিলোহার্টজ মানে ১০০০ হার্টজ— ১০০০ তরঙ্গ। অর্থাৎ, ১ কিলোহার্টজ মানে প্রতি সেকেন্ডে শব্দতরঙ্গটি এক হাজার বার প্রসারিত হয়। এ ভাবে কম্পাঙ্ক বাড়লে প্রতি ধাপে যখন কিলোহার্টজ মেগাহাহার্টজ-এ এবং মেগাহার্টজ গিগাহার্টজ-এ ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে, তখন হাজারের শেষে তিনটি করে শূন্য বাড়তে থাকে।

১৯৩৪ সালে বিজ্ঞানী ওয়েন্ডেল মেরেডিথ স্ট্যানলি, টোবাকো মোজাইক ভাইরাসে খুব বেশি কম্পাঙ্কের শব্দপ্রয়োগ করেন। এতে বেশ কিছু ভাইরাস নিষ্ক্রিয় হলেও, বেশ কিছু ভাইরাস আবার আগের মতোই সক্রিয় থাকে। পলিয়োমায়েলিটিস, হিউম্যান ইনফ্লুয়েঞ্জা, সোয়াইন ইনফ্লুয়েঞ্জার উপর প্রতি সেকেন্ডে ৯০০০ হার্টজ অর্থাৎ ৯ কিলোহার্টজ কম্পাঙ্কে টানা এক ঘণ্টা শব্দতরঙ্গ প্রয়োগ করেও এই ভাইরাসদের নিষ্ক্রিয় করতে পারা যায়নি।

অন্য দিকে, প্রতি সেকেন্ডে ৪,৫০,০০০ হার্টজ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ টানা এক ঘণ্টা প্রয়োগ করে পলিয়োমায়েলিটিস ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করা গিয়েছে। এ ছাড়াও প্রতি সেকেন্ডে ৭০০,০০০ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ প্রয়োগ করে টাইপ-এ ইনফ্লুয়েনজা ভাইরাসকে প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করায় সফল বিজ্ঞানীরা। এদের প্রত্যেকেরই প্রাথমিক কাজ এটাই দেখায় যে, ভাইরাসের নিষ্ক্রিয়করণ কেবল উচ্চ ক্ষমতার শব্দতরঙ্গ নয়, পার্শ্ববর্তী কোষ বা কলার সঙ্গে এর সংযোগের ধরনের উপর নির্ভর করে।

আরও এ রকম তথ্যে আসার আগে, আমাদের জানা উচিত ভাইরাসের গঠন ঠিক কী রকম। ভাইরাস কিন্তু স্থান, কাল এবং পাত্র অনুযায়ী জীব বা জড় পদার্থ হিসেবে কাজ করে। কিছু ভাইরাসের বাইরে একটি আবরণ বা এনভেলপ থাকে, কারও সেটা থাকে না। এনভেলপের তলায় থাকে ক্যাপসিড। এনভেলপ তৈরি হয় কোষপর্দা দিয়ে, এবং এতে থাকে ভাইরাস থেকে তৈরি গ্লাইকোপ্রোটিন। এই গ্লাইকোপ্রোটিনই ভাইরাসকে প্রাণী বা উদ্ভিদের কোষে ঢুকতে সাহায্য করে। কোনও ভাবে এই গ্লাইকোপ্রোটিনের গঠন নষ্ট করে ফেলতে পারলেই হবে! ভাইরাসগুলো এক রকম নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে এর ফলে।

আবার অন্য দিকে, কিছু ভাইরাসের এনভেলপ থাকে না। এদের একদম বাইরের আবরণ যেটা থাকে, তাকে ক্যাপসিড বলে। ক্যাপসিডও প্রোটিন দিয়েই তৈরি হয়। এনভেলপের মতো ক্যাপসিডও ভাইরাসকে প্রাণী বা উদ্ভিদ কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

আরও বিস্তারিত ভাবে বলা যায়, ক্যাপসিড বা এনভেলপে অবস্থিত প্রোটিন হল ভাইরাসের আইডেন্টিটি কার্ড। প্রাণী বা উদ্ভিদদের কোষে অসংখ্য রিসেপ্টর বা গ্রাহক প্রোটিন থাকে। রিসেপ্টর কারা? বাইরে থেকে আসা কোনও রাসায়নিক বস্তুকে কোষের ভিতর ঢুকতে দেবে কি দেবে না, তা নির্ধারণ করে। যে কোনও ভাইরাসের বাইরের আবরণ দিয়েই রিসেপ্টর ভাইরাসের রাসায়নিক গঠন বুঝতে পারে এবং ভাইরাসকে কোষের ভিতরে প্রবেশের পথ তৈরি করে দেয়। ভাইরাসের বাইরের আবরণের গঠনে একটু এ দিক-ও দিক হলেই রিসেপ্টর আর ভাইরাসের গঠন বুঝতে পারে না।

তা হলে কি রিসেপ্টর ক্ষতিকর? ভাইরাসকে ঢুকতে দেবে কেন কোষে? উত্তর হল, না। রিসেপ্টার ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থকে অন্য রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে আলাদা করে চিনতে পারে না। রিসেপ্টর কেবল রাসায়নিক গঠন চিনে ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ করতে দেয়। সুতরাং, ভাইরাসের ওই বাইরের আবরণটি নষ্ট হওয়া, ভাইরাসের আইডেন্টিটি কার্ড বা পরিচয়পত্র হারিয়ে ফেলার মতোই।

২০০৮ সালে আমেরিকার আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ অটো স্যাঙ্কি এবং তার ছাত্র এরিক ডাইকম্যান একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার ফলে ভাইরাসের প্রতিটি পরমাণুর কম্পাঙ্ক হিসেব করা যায়। স্যাঙ্কি ওই সালে জানুয়ারি সংখ্যার ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’ জার্নালে লেখেন, মাত্র ৬০ গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কে টোবাকো নেক্রোসিস নামে একটি প্লান্ট ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হন। তার কিছু দিন পরেই আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির আর এক গবেষক প্রমাণ করেন, লেজার আলো দিয়ে ভাইরাসের ভিতরকার অণু-পরমাণুতে তীব্র কম্পন তৈরি করা যায়। এর ফলে ভাইরাসগুলো কম্পনের ফলেই মারা যাবে। ২০১৫ সালে বিজ্ঞানী শু ইয়ং ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রথম দেখান ৮-১০ গিগাহার্টজ শক্তিবিশিষ্ট মাইক্রোওয়েভ দিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একদম বাইরের আবরণ অর্থাৎ ক্যাপসিড নষ্ট করা যায়। এখানে লেজার কিন্তু অনেক বেশি কম্পাঙ্কের, অর্থাৎ তীব্র ক্ষমতাযুক্ত।

১৯৯১ সালে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়-এর এক দল গবেষক ‘অ্যাপ্লায়েড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল মাইক্রোবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশ করেন ২৬ কিলোহার্টজ-এর আল্ট্রাসনিক ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে ফেলিন হার্পিস ভাইরাস (এফএইচভি-১)’এর একদম বাইরের আবরণ অর্থাৎ এনভেলপ নষ্ট করা যায়। ফেলিন হার্পিস ভাইরাস প্রজাতির মধ্যে হিউম্যান হার্পিস ভাইরাস, হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ ওয়ান এবং টু-ও অন্তর্গত। অর্থাৎ, এই কম্পাঙ্ক প্রয়োগ করে এই ভাইরাসগুলোর এনভেলপ নষ্ট করা এবং এই ভাইরাসগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব। এই ভাইরাসগুলো ত্বকের কিউটিন স্তরের রক্তপরিবাহী অংশে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং মূত্রনালীতে সংক্রমণ করে। কিন্তু সমস্যা হয় ক্যালিসিফেরাস ভাইরাসদের নিয়ে। ২৬ কিলোহার্টজ আল্ট্রাসনিক সাউন্ড দিয়েও এদের নষ্ট করা যায় না। কারণ এদের এনভেলপ থাকে না, এদের থাকে ক্যাপসিড। যার সাহায্যে এরা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই ক্যাপসিড ভাঙা কিন্তু ভাইরাসের এনভেলপ ভাঙার মতো সোজা নয়। এই গবেষণায় একটাই জিনিস শেষে প্রমাণিত হয়, এনভেলপ-যুক্ত ভাইরাস বাহ্যিক শক্তির প্রয়োগে সহজে নষ্ট হয়, কিন্তু ক্যাপসিড-যুক্ত ভাইরাসের ক্ষেত্রে তা হয় না।

এই মুহূর্তে নোভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯’এর ভয়ে সারা পৃথিবী তটস্থ। খুব অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ার কারণে এখনও গবেষণা করে দেখা হয়নি যে নোভেল করোনাভাইরাসের উপর ঠিক কত কম্পাঙ্কের শব্দ প্রয়োগ করে তাকে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে। তবে পুরনো গবেষণা বলছে, বেশ তীব্র কম্পাঙ্কের শব্দ প্রয়োজন যে কোনও ভাইরাস মোকাবিলা করতে। এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল, শাঁখ, কাঁসর, ঘণ্টা, থালা-বাটি এবং হাততালি মাত্র কয়েক হার্টজ কম্পাঙ্কের শব্দ উৎপাদন করে।

শুরুতে রেজোন্যান্স ফ্রিকোয়েন্সির কথা বলছিলাম। শব্দের উৎস, অর্থাৎ কাসর, ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল ইত্যাদিতে বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ করলে তখনই আল্ট্রাসাউন্ড অর্থাৎ তীব্র কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি হবে, যখন বাহ্যিক শক্তিও তীব্র কম্পাঙ্কের হবে। মানুষের শরীরে সেই অতিমানবীয় শক্তি নেই, যা দিয়ে সে তীব্র কম্পাঙ্ক তৈরি করে কাঁসর, খোল-করতাল, শাঁখ কিংবা হাততালির মাধ্যমে আল্ট্রাসাউন্ড তৈরি করে করোনার মতো ভাইরাসকে নষ্ট করবে। করতাল, ঝাঁঝ, কাঁসর কিংবা ঘণ্টা ধাতু নির্মিত। আল্ট্রাসাউন্ড সেখান থেকে অবশ্যই তৈরি হতে পারে। যেমন, ধাতুতে লেজার প্রয়োগ করে আল্ট্রাসাউন্ড তৈরি করা গিয়েছে। প্রসঙ্গত, লেজারের কম্পাঙ্ক এক লক্ষ কোটির বেশি। দল বেধে থালা-বাটি বাজিয়ে ভাইরাস তাড়ানোর উৎসব পালন করা অজ্ঞতারই পরিচয়। বরং রবিবারের বিকেলে এত বেশি লোকজন জমায়েত হয়ে যে উৎসব পালন করেছেন তাতে ভাইরাস সংক্রমণই আরও বেশি করে নিশ্চিত হয়েছে। সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..