1. [email protected] : admi2019 :
  2. [email protected] : খুলনা বিভাগ : খুলনা বিভাগ
  3. [email protected] : Monir monir : Monir monir
  4. [email protected] : Mostafa Khan : Mostafa Khan
  5. [email protected] : mahin : mahin khan
মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:১৫ পূর্বাহ্ন

দালাল চক্রের হাতে জিম্মি নরসিংদী সদর হাসপাতাল, অতিষ্ঠ রোগি ও সজনরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১
  • ১৫১ বার পঠিত

মো:শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী

রাত তখন সাড়ে ১০টা কি তার একটু বেশী হবে নরসিংদী সদর হাসপাতালের ইমার্জেন্সির মাঝ বয়সী একটা আর্তনাদ করে কাঁদছে আর মাঝে মধ্যে চেঁচিয়ে উঠে বলতে শুনা গেছে ‘এখন কই গেলি শালারা। কুত্তারবাচ্চারা আমার মরা পোলারে লইয়্যা তোরা দালালী করতে চাইচোত। অহন সামনে আই, সবডি পলাইছত কে পারলে অহন সামনে আয়।’ ওই লোকটার বকাঝকার বিষয়টি জানতে এগিয়ে যায় এই প্রতিবেদক। কাছে গিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করতেই লোক প্রতিবেদক বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুক্ষণ আগে মোটরসাইকেল এক্সিডেন্টে মারা গেছে। হাসপাতাল আনার পর ইমার্জেন্সির ব্রাদাররা বলেন একটি একটা ইসিজি করে দেখতে আর তখনই হামলে পড়ে কয়েকটি দালাল। আমার মরা ছেলের লাশ নিয়ে টানাহেছড়া শুরু করে দেয়। ইমুক ক্লিনিকের ইসিজি খুব ভাল হয়। খরচও কম নেয়। এই সব আর কি। ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করার পর সবগুলান বাগছে।’  কথাগুলো বলছিলেন গত শুক্রবার নরসিংদী সদর উপজেলার নজরপুর ইউনিয়নের শেখ হাসিনা সেতু সংলগ্ন  কালাইগোবিন্দপুর এলাকায় মোটরসাইকেল দূর্গটনায় নিহত আরিফের পিতা রফিকুল ইসলাম। নরসিংদী সদর হাসপাতালে রোগী নিয়ে দালালদের টানাহেছড়া নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ হাসপাতালে প্রতিদিনই এমন দৃশ্য নজরে আসে।

নরসিংদী ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল দিন দিন দালাল চক্রের দৌরাত্মের ফলে বর্তমানে তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে রোগী ও তাদের আত্বীয়স্বজন। হাসপাতালের সব জায়গায় এদের অবাধ বিচরণ। হাসপাতালের গেট, জরুরী বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, আউটডোর কোথায় নেই এরা? এসকল দালাল চক্র স্থানীয় কোন না কোন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় থেকে এসকল কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নরসিংদী সদর হাসপাতালে ৩ শ্রেণির দালাল চক্র কাজ করে। একটি চক্র হাসপালালে রোগি এলেই হামলে পড়ে। তাদের কাজই হচ্ছে রোগি ভাগিয়ে ভাল চিকিৎসার নাম করে বেসরকারী ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় চক্রটি হাসপাতালের বহিঃবিভাগে বিভিন্ন ডাক্তারদের কক্ষের বাহিরে অবস্থান নেয়। রোগিরা ডাক্তারের কক্ষ থেকে বের হয়ে আসার পর তাদের হাত থেকে ম্লিপটি ছিনিয়ে নিয়ে দেখে কি কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। রোগি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কম খরচে ওই পরীক্ষাগুলো করিয়ে দেবেন বলে ফুসলিয়ে নিয়ে যান বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টার গুলোতে । অথচ ওই পরীক্ষাগুলোই নামমাত্র খরচে হাসপাতাল থেকে করা যায়। অপর দালাল চক্রটি যারা জরুরী বিভাগ ও আন্ত: বিভাগে অবস্থান নেন। তারা মূলত হাসপাতালের বাহিরের বিভিন্ন ওষুধের দোকানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। কোন রোগির ওষধ প্রয়োজন হলে তারাই দৌড়ে-ঝাপ্টে ওষুধ এনে দেন। টাকার কথা বললে বলা হয় ‘দিয়েন এক সাথে। এখনতো আর চইল্যা যাইতাছেন না।’ রোগি বা তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাকীতে ওষুধ পাওয়ার সুবিদা ভোগ করতে চুপ হয়ে যান।

এই সকল দালাল চক্র ঢাকার উত্তরাস্থ আল আশরাফ ডায়াগনোষ্টিক সেন্টার ও লেকভিউ ক্লিনিক বা স্থানীয় কোন না কোন প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনোষ্টিক সেন্টার ও ফার্মেসীর কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নরসিংদী সদর হাসপাতালের চার পাশে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা এই সকল প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারগুলোর মালিকানার ক্ষেত্রে হাসপাতালের কোন না কোন ডাক্তার-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন। তারাই ওই সকল দালালদের নিয়োগ করেছেন। তাদের মদদের ফলে দালালরা  হয়ে উঠেছে আরও বেশী বেপরোয়া। হাসপাতালে ভর্তিসহ চিকিৎসা করাতে হয় তাদের মাধ্যমেই। যে কোন অপারেশনের ক্ষেত্রেও রোগী বা তার আত্মীয় স্বজনদের চুক্তিবদ্ধ হতে হয় দালালদের সঙ্গে। অপারেশন থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এরা। অপারেশনের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধও দালালদের পছন্দের দোকান থেকে বেশি দামে কিনতে হয়।

দূর দূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীরাই মূলত তাদের শিকার। সংঘবদ্ধ দালালদের বিরুদ্ধে অনেকেই প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। অধিকাংশ দালাল হাসপাতালের বিভিন্ন পদে কর্মরত, আর অন্যরা কর্মচারী না হয়েও কাজ করে কর্মচারীর মতো। কাজ শেষে তারা টাকা দাবি করে। তাছাড়া কোন জখমী হাসপাতালে ভর্তি হলে দালাল ছাড়া সার্টিফিকেট প্রদান হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে পুরুষদের চেয়ে নারী দালালের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সকল দালালরা কোন না কোন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় থেকে তাদের কাজ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কাজে বাধা দিতে গেলে ডাক্তার বা নার্সদের অপমান-লাঞ্চনা কিংবা হুমকি-ধমকিও প্রদান করার অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিহ্নিত দালালদের মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন, মুন্না, শফিক,  মোহাব্বির, মনির, সজল, বাবু, মোস্তফা, রাসেলসহ আরও বেশ কয়েকজন। সূত্রে জানা যায়, ওইদিন মৃত আরিফের লাশের ইসিজি করাতে যারা টানাহেছড়া করেছেন তারা হলেন বাবু, মোস্তফা, রাসেল ও মনির।

সুত্র আরও জানায় শফিক সদর হাসাপাতালে দালালী করে হাসপাতালের পাশে নিজেই গ্রীন লাইফ নামে একটি ক্লিনিক খুলে বসেছেন। মূলত অন্যান্য দালালরা তার ক্লিনিকেই বেশীর ভাগ রোগি বাগিয়ে আনেন।

এছাড়া হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের বিরুদ্ধেও রোগিদের অন্যত্র পাঠিয়ে পরিক্ষা-নিরীক্ষা করানোর অভিযোগ রয়েছে।

এব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের চার পাশে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা এই সকল প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারগুলো যেকোন পরিক্ষার ক্ষেত্রে যে ডাক্তার প্রেসক্রাইভ করেছে তাকে শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কমিশন দিয়ে থাকেন। তাই ডাক্তাররা উপরি কামাই হিসেবে রোগি দেখার সময় যে পরিক্ষা গুলো দেন তা বাহিরে থেকে করিয়ে আনার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তারা গুনাক্ষরেও তা বলে না যে এই পরিক্ষা গুলো স্বল্প খরচে এই হাসপাতাল থেকে করানো সম্ভব।

শুধু হাসপাতালের আত্ম: বিভাগ কিংবা বহি: বিভাগ নয় হাসপাতাল মর্গেও এদের দৌরাত্ম দেখা যায়। মর্গে কোন লাশ আসলে তা কাটা ছিড়ার জন্য ডুমকে নেশা  পাণের কথা বলে এই সকল দালালরা মোটা অংকের টাকা দাবী করেন লাশের স্বজনদের কাছে।  টাকা না দিলে লাশ ছুয়েও দেখেন না মর্গের ডুম। পরবর্তীতে দালালদের সহায়তা টাকা হাতে পেয়ে লাশের কাটা ছিড়া শুরু করে ডুম।

এদিকে দালালদের নিয়ে প্রায়শ: সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হতে হয় হাসপাতালটি আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সৈয়দ আমীরুল ইসলাম শামীমকে। শনিবার তিনি হাসপাতালে তার গাড়ী থেকেই সামলে পড়ে যায় একজন দালাল। তিনি কালবিলম্ব না করে সাথে সাথে তার কলার চেপে ধরে টেনে হিজড়ে তার কক্ষের দিকে নিয়ে আসতে থাকলে উপস্থিত লোকজন ও হাসপাতালের স্টাফদের অনুরোধে ওই দালালকে ছেড়ে দেন।

সিভিল সার্জন’র কার্যালয় জেলা প্রশাসনের সহায়তায় মাঝে মধ্যে দালালদের ধরতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও এই দালাল চক্র থাকে ধরা ছোয়ার বাইরে। কেননা আগ থেকেই মোবাইল কোর্টের বিষয়টি তারা জেনে যায়। মাঝে মধ্যে এক দুজন ধরা পড়লেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে এক দু’দিন পর বের হয়ে আসে।

এ ব্যাপারে নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সৈয়দ আমীরুল ইসলাম শামীম দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দালালরা তাদের এসকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। আমাদের একপাশে বেপারীপাড়া অন্য পাশে কাউরিয়া পাড়া এ দুই এলাকার মানুষের মদদেই দালালরা সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ দালালই এখানের স্থানীয় বাসিন্দা তাই তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। ইতিপূর্বে একাধিকবার তাদের আইনের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে কিন্তু জামিনে মুক্তি পেয়ে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুনরায় তারা স্ব-স্থানে ফিরে আসে। তাই সদর হাসপাতালের দালাল নির্মূলে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী সিভিল সার্জন ডাঃ নুরুল ইসলাম বলেন, সকল হাসপাতালেই কমবেশি দালাল রয়েছে। তবে সদর হাসপাতাল থেকে দালাল নির্মূলে আমরা পুলিশ সুপার, মডেল থানাসহ প্রশাসনের সহযোগিতায় বেশ কয়েকবার দালালদের ধরে লাঠিপেটা করে আইনের আওতায় এনেছি কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই তারা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে।

দালাল নির্মূলে বিগত সময়ের ন্যায় তাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলেও জানান তিনি।

নরসিংদী সদর হাসপাতালটিকে দালাল চক্ররের হাত থেকে মুক্ত করতে প্রসাশনের আসু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..